সকালটা জাপানী মায়ের, বিকেল বাংলাদেশী বাবার

আইনি লড়াইয়ের পর গতকাল মঙ্গলবার দিনের প্রথম ভাগের পাঁচ ঘণ্টা দুই সন্তানের সঙ্গে কাটালেন জাপানি মা। আর বিকেল ৩টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা দুই সন্তানকে আগলে রাখলেন তাদের বাবা। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে মা-বাবার এমন বিচ্ছিন্ন স্নেহ আর ভালোবাসাময় এক ব্যতিক্রমী দিনই পার করল দুই শিশুসন্তান।
গতকাল ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই মেয়ে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে দেখতে যান ইমরান শরীফ। সকাল সাড়ে ১০টায় এসে বসেছিলেন সাপোর্ট সেন্টারের অভ্যর্থনা কক্ষে। কখন ঘড়ির কাঁটা ৩টা ছোঁবে, এমন প্রতীক্ষার প্রহর যেন কাটছিল না তার। তখন দুই সন্তানের সঙ্গে তাদের জাপানি মা নাকানো এরিকো সময় কাটিয়ে দুপুর ১টায় বের হন। ইমরান শরীফ এগিয়ে যান এরিকোর দিকে। জাপানি ভাষায় ইমরান তার উদ্দেশে কয়েকটি বাক্য বললেন। যার বাংলা- ‘একদিকে করোনাভাইরাস, অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ। এ অবস্থায় মেয়েদের এখানে থাকা কতটা নিরাপদ! তার চেয়ে বরং আদালতে আবেদন করো, যেন ওদের কোনো হোটেলে নিয়ে রাখা যায় কিনা।’ এরিকোর জবাব- ‘মেয়েরা এখানেই ভালো আছে।’ নিরাশ হয়ে ইমরান বলেন- ‘বুধবার তুমি কী খাবার আনবে মেয়েদের জন্য; যাতে খাবারের মেন্যু দু’জনের একই না হয়ে যায়, সেজন্য জানতে চাওয়া।’ এরও কোনো উত্তর পাননি এরিকোর দিক থেকে। প্রায় নিঃশব্দে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের চত্বর পেরিয়ে ব্যস্ত সড়কের দিকে চলে যান জাপানি মা।

নাকানো এরিকোর আইনজীবী শিশির মনির গতকাল সমকালকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ আগস্টের আগ পর্যন্ত দুই শিশু ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকবে। এর মধ্যে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করব।

দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ইমরান জাপান থেকে দেশে আসেন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর মেয়েদের ফিরে পেতে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে আসেন এরিকো। পরদিন হাইকোর্টে রিট করেন। দুই শিশুকে আগামী ৩১ আগস্ট হাজির করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এর আগেই গত রোববার রাতে দুই শিশুকে তাদের বাবার কাছ থেকে নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। আদালতের নির্দেশে সোমবার থেকে শিশু দুটিকে তেজগাঁওয়ে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়। সেখানে দুই শিশুর সঙ্গে তাদের বাবা-মা পাঁচ ঘণ্টা করে সময় কাটাতে পারবেন বলে আদেশ দেন আদালত। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মা এরিকো এবং বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাবা ইমরান মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার সূত্র জানিয়েছে, দুই বোন একই কক্ষে থাকছে রাতে। গতকাল সকাল ৮টায় মা এরিকো মেয়েদের জন্য জাপানি খাবার নিয়ে যান। তিনি যখন সেখানে যান, তখন দুই মেয়েই ঘুমিয়ে ছিল। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও তাদের ঘুম ভাঙিয়ে মা-ই তাদের খাবার খাওয়ান। পাঁচ ঘণ্টা মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ১টায় তিনি চলে যান। পরে দুই শিশুকে ছাদে ঘুরতে নিয়ে যান সাপোর্ট সেন্টারের দায়িত্বরতরা।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সামনে দুপুরে ইমরান জানান, মেয়েদের খাবার হিসেবে গরুর মাংসের ভুনা, ভাত, পেঁপে আর শসা নিয়ে এসেছেন বারিধারার বাসা থেকে। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা কখনও এভাবে আলাদা থাকেনি। তাদের এখানে রেখে ঘরে মন টিকছে না। তাই বেশির ভাগ সময় আমি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের চত্বরেই কাটাচ্ছি। মেয়েদের জন্য এখানে মাটিতেও শুয়ে থাকতে পারি। সোমবার মধ্যরাতে বাসায় গিয়েছি। জানতাম বিকেল ৩টা থেকে দেখার সুযোগ মিলবে। কিন্তু বাসায় থাকতে পারিনি, তাই সকাল সাড়ে ১০টায় চলে এসেছি। মেয়েদের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। মেয়েরা যে ভবনে আছে, সেই ভবনের পাশে কিংবা রিসিপশনে বসে থাকলেও মানসিক শান্তি পাচ্ছি। অনেক সময় কয়েকটা দেয়ালের ওপাশেই ওরা রয়েছে। এমনও মনে হয়, দূরে বসেও যেন ওদের কথা বা হাঁটহাঁটির শব্দ পাই। কল্পনায় ওরা নানা রূপেই ধরা দেয়। সোমবার নিজ হাতে মেয়েদের জন্য বাসা থেকে রুটি বানিয়ে এনেছিলাম।’

তিনি জানান, বড় মেয়ে জেসমিন মালিকার বয়স ১১ বছর, সে জাপানে ইংলিশ মিডিয়ামে ছষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। মেজো মেয়ে লাইলা লিনার বয়স ৯ বছর ১০ মাস। সে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। জেসমিন বই পড়তে পছন্দ করে। লাইলার পছন্দ খাওয়া। বাংলাদেশি খাবার তার খুব পছন্দ। তারা বাংলা ভাষায় একটু একটু কথা বলতে পারে। বাংলা পড়ার চেষ্টা করে। বাংলা ভাষা বোঝে তারা। তিনি বলেন, তাদের ঘরে তিন কন্যাসন্তান। ছোটটির বয়স সাত। সে তার মায়ের জিম্মায় রয়েছে।

ইমরান জানালেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ১৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর জাপানে যান। সেখানে চিকিৎসক এরিকোর সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর প্রেম। ২০০৮ সালে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের সময় এরিকো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন এসমা শরিফ। তারা জাপানের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিয়ের পর টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। ২০ বছর তিনি জাপানে বসবাস করেন। তাকে না জানিয়ে স্ত্রী ও শ্বশুর জাপানে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কেনেন কিস্তিতে। তাতে তার কোনো মালিকানা ছিল না। এরপরও তাকে কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় তাদের। এ ছাড়া সন্তানরা কোন ধর্মের রীতিনীতি মেনে বড় হবে, ওদের খাবারের মেন্যুসহ ছোটখাটো নানা বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এর কিছুদিন পর থেকে আলাদা বসবাস শুরু করেন তারা। তবে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে জাপানি মা এরিকোর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি আমাদের রিপোর্টার।

গত জানুয়ারিতে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। এরিকো মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে সে দেশে গত ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। আদালত মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দেশে চলে আসেন ইমরান। এদিকে টোকিওর পারিবারিক আদালত গত ৩১ মে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। এরপর মেয়েদের ফিরে পেতে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে আসেন এরিকো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *