দেশে ফিরে তালেবানের যেসব প্রশংসা করলেন কলকাতার তমাল ভট্টাচার্য

আফগানিস্তান থেকে নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনছে ভারত। কাবুল থেকে কয়েকদিন আগে কলকাতায় ফিরেছেন দুই বাঙালি। ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমানে তারা প্রথমে কাবুল থেকে দিল্লি পৌঁছান। সেখান থেকে কলকাতায় নামেন। কলকাতার এই দুই বাঙালি হলেন তমাল ভট্টাচার্য ও স্বরজিৎ মুখোপধ্যায়।

তারা দুজনে কাবুলে কাজ করতেন। কলকাতায় ফিরে আসা এই দুই বাঙালি আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছে বার্তা সংস্থা এবিপি আনন্দ, জিনিউজসহ স্থানীয় গণমাধ্যমে তমাল ভট্টাচার্য সেই পুরো পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য তার বক্তব্য পুরোপুরি তুলে ধরা হলো এখানে।

‘বর্তমানে মোল্লা আব্দুল গনি হচ্ছেন তালেবানদের হেড। তিনি এখন ইসলামিক আমিরাত অফ আফগানিস্তানের আমির। তিনি ইন্ডিয়ান এবং বাকি প্রবাসী যারা সেখানে রয়েছেন তাদেরকে দ্রুত কাজে ফেরার জন্য অনুরোধ করেছেন।

তিনি আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে আমরা যেন কোনো চিন্তা না করি। তিনি বলেছেন যে আমরা ৯০ দশকের তালেবানদের মতো না। তিনি চাইছেন বর্তমানে একটা নতুন দেশ তৈরি করতে।

তবে আমরা জানি না তার এই প্রতিশ্রতি কতটুকু কি সত্যি। হতে পারে এটা সম্পূর্ণ একটা আন্তর্জাতিক খেলা। সময় সেটা প্রমাণ করবে। আমার সাথে যেসব ভারতীয়রা ছিলেন তারা কাবুলে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে মেকানিক পর্যায়ের লোকও আছেন। আমাদেরকে নিরাপদভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সঙ্গে ধন্যবাদ দিচ্ছি কিছু আফগানদেরও। আমাদের নিরাপদ যাত্রার জন্য তারা খুব একটা কাজ করেছেন।’

তমাল বলছিলেন, ‘১৫ আগস্ট আমি যখন স্কুল (তমালের কর্মক্ষেত্র) থেকে ফিরছিলাম ক্লিয়ারেন্স কাগজ নিয়ে, তখন হঠাৎ করে সম্ভবত সকাল ১১টা অথবা সাড়ে ১১টায় খেয়াল করলাম রাস্তাঘাটে অনেকে আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে। মানুষজন যে যেভাবে পারছে, ছুটছে। কেউ গাড়িতে, মোটরসাইকেলে দৌড়ে পালাচ্ছে ভয়ে। তারা বলছে তালেবানরা আসছে। তখন আমিও একটু ঘাবড়ে গেলাম এমনকি আমার সাথে থাকা অন্যান্য শিক্ষকরাও ঘাবড়ে গেলেন। আমাদের সঙ্গে তখন অন্যান্য দেশের মানুষও ছিলেন।

স্যার চিন্তা করবেন না:

তখনকার যে সরকারের একজন পুলিশ অফিসার এসে বললো যে আপনাদের তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে তালেবানরা আসছে। তখন আমি ২ঘণ্টার জ্যাম পেরিয়ে আমার বাড়ি পালুয়ান্দু সেখানে ফিরলাম। মিনিট ত্রিশের মধ্যেই তালেবানরা এলো এবং খোঁজ করা শুরু করলো। দেখা গেলো কোনো যুদ্ধ হয়নি কাবুলে। এটি ছিল আফগানিস্তান সরকার থেকে তালেবানদের কাছে ক্ষমতার একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় স্থানান্তর। কোনো গোলাগুলি হয়নি। গোলাগুলি যা হওয়ার তা হয়েছে কাবুল বিমানবন্দরে। আমেরিকান সৈন্যরা এয়ারপোর্ট নিজেদের দখলে রেখেছিলো। কারণ তাদের প্রতিনিধিদের এবং যারা দোভাষী আফগান যারা আমেরিকানদের সাথে বিভিন্নভাবে কাজ করেছিলো তাদেরকে আফগানিস্তান থেকে ফিরিয়ে নিতে চায় আমেরিকা। কারণ আশঙ্কা রয়েছে তারা আফগানিস্তানে থাকলে তালেবানরা তাদের মেরে ফেলতে পারে।

সেদিন কাবুল বিমানবন্দরে একটা গণ্ডগোল সৃষ্টি হয়েছিলো। সেদিন আমেরিকানরাই আসলে গুলি টুলি করে ঝামেলা করেছে। তালেবানরা কাউকে জ্বালাতন করেনি এবং তারা কোনো একটা মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি। তালেবানরা প্রথমে এসেই আমাদের বললো স্যার চিন্তা করবেন না আমরা আপনাদের কিছুই করবো না। আপনাদের আমরা হিফাজত করবো (ওস্তাদ আপ ফিকার মাত কারো হাম কুচ নেহি কারেঙ্গে হাম আপকি হেফাজাত কারেঙ্গে)।

তালিবানরা বন্ধু:

আমাদের সঙ্গে তালেবানদের বৈঠক হয়েছিলো। তখন তারা বলেছিলো আপনারা ভয় পাবেন না আমরা আপনাদের সঠিক নিরাপত্তা দেবাে যেন কোনো থার্ড পার্টি আপনাদের মেরে ফেলতে না পারে। থার্ড পার্টি বলতে অন্যান্য টেরোরিস্ট পার্টিকে বোঝানো হয়েছে কারণ তালেবানরা চাচ্ছিলেন না তাদের বদনাম হোক। ওরা আমাদের ইউনিভার্সিটিতে এবং যত শিক্ষক ছিলেন সবাইকে এক জায়গায় রাখল। তারা আমাদের সাথে ক্রিকেটও খেলেছিলো। আমাদের তারা যথেষ্ট ভরসা যুগিয়েছে। রাতে পাহারা দিয়েছে। মেয়েদেরকেও সব ধরনের সাহায্য করেছে তারা। তালেবানদের সঙ্গে কোনোরকম সমস্যা আমাদের হয়নি। তারা আমদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। যদিও একটা অজানা আশঙ্কা ছিল অনেকের মধ্যেও। কিন্তু তালেবানরা তাদের ব্যবহার দিয়ে আমাদের সবার সব চিন্তা বদলে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের সাথে যোগাযোগে ছিলাম তাদের আশস্ত করেছি ভয় না পাওয়ার জন্য। কাবুলে কোনো সমস্যা নেই সব দোকানপাট স্বাভাবিক চলছে। আমরা যখন আগে কাবাব খেতাম ১৫০ টাকায়। নান কাবাবে এখন মাংসের পরিমাণ ডাবল হয়ে গেছে। তালেবানদের মতে কোনো মানুষকে ঠকানো যাবে না। অনেক ধরনের আইন বদল হয়ে গেছে তাদের। ওরা ধর্মপরায়ন মানুষ। সম্ভবত তাই তারা অনেক ভালো কাজ করেছেন বলে আমি মনে করি।

তমাল আরও বলেন, তাদের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তারা আমাদের সাথে চমৎকার আচরণ করেছে। এমনকি ওরা আমাদের ভারতীয় অ্যাম্বাসীকে নিরাপত্তা দিয়েছে।

তালিবানদের সাহায্যেই দেশে ফেরা:

তমাল জানিয়েছে, তালিবানদের তিনরকমের পদ রয়েছে। তালিবান অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, তালিবান ফাইটার্স এবং তালিবান ল অ্যান্ড ফোর্সেস। এদের সাহায্যেই দেশে ফেরা বলে জানিয়েছেন তিনি। যাঁদের কাছে পাসপোর্ট নেই, হারিয়ে গিয়েছে, তাঁদেরকেও বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে তালিবানরা। তাঁদেরকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে বাড়তি বন্দোবস্ত করা হয়েছিল তালিবানদের তরফে। খাবার থেকে জল সবই দেওয়া হয়েছে। তালিবানদের সম্পর্কে যা প্রচার করা হয়, তা একেবারেই ঠিক নয় বলেই দাবি করেছেন তিনি। তালিবানদের গুলিতে মৃত্যুর অভিযোগ প্রসঙ্গ তমাল বলেছেন, যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তা একেবারে অন্য কারণে। তিনি সংবাদ মাধ্যমের সামনে বারবারই বলতে চেয়েছেন, তালিবানদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা তৈরি করা হয়েছে। কেননা তাঁরা তালিবানদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছেন, অন্য কিছু নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *