শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ শুক্রবার | ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

সোসাইটি অফ বাংলাদেশী লইয়ার্সের আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২০ | ১:৩৩ পিএম | 68 বার

সোসাইটি অফ বাংলাদেশী লইয়ার্সের আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

সোসাইটি অফ বাংলাদেশী লইয়ার্স ( এসবিএল ) ইউকে কর্তৃক সম্প্রতি “দ্রুত ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ, বাংলাদেশে মামলার দীর্ঘ সূত্রিতা নিরসনে যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা (Access to Justice: Case Backlog Bangladesh Perspective: Sharing UK Experience)” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এসবিএলের  সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মো: ফখরুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার মো: সাইমুদ্দিন খন্দকার সায়েমের উপস্থাপনায় এবং এসবিএলের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মো: নুরুল গাফফারের সভাপতিত্বে উক্ত সেমিনারে দেশ-বিদেশের অসংখ্য আইনজীবী, সলিসিটরস, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক ও প্রফেশনাল অংশগ্রহণ করেন।

উক্ত সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি মো: রেজাউল হাসান। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘ সূত্রিতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করেন বিচারকের স্বল্পতা ও কোর্ট রুমের অপর্যপ্ততাকে। এছাড়াও মামলার দীর্ঘ সূত্রিতার জন্য আরো দায়ী করেন পদ্ধতিগত আইনের ত্রুটি, কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ত্রুটি, জটিলতা এবং বিচার বিভাগের দুর্নীতিকে দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরেনের ক্ষেত্রে বড়  বাধা হিসেবে চিহৃত করেন।

বিচারপতি হাসান তার বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রায় তিন মিলিয়নের উপর মামলা পেন্ডিং রয়েছে বলে উল্ল্যেখ করেন। বাংলাদেশে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিকরনে কিছু প্রস্তাবনাও তিনি পেশ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – বিচারকদের গ্রীস্মকালীন ও শীতকালীন ছুটি কমানো, সান্ধ্যখালিন কোর্ট চালু করা, অধিক পরিমানে বিচারক নিয়োগ করা, আরো বেশি পরিমান কোর্টরুম তৈরী করা, কোর্ট এবং বিচারকার্যে বাজেট বৃদ্ধি করাসহ পৃথক বিচারিক প্রশাসন করা, অহেতুক ও ঘন ঘন বিচার কাজের মুলতবি নিষিদ্ধ করণ, কার্যকরী সামন (summon) পদ্ধতি নিশ্চিতকরণ, বিচারকাজ পরিচালনায় বাধ্যতামূলক টাইম লিমিটকে কার্যকর করা, দ্রুত সময়ের মধ্যে interlocutory বিষয়ের নিস্পত্তি করে মূল বিচার বিচার কাজ সম্পন্ন করা, বিচারের রায়/আদেশ  কার্যকরের জন্য পৃথক বিচারিক আদালত গঠন করা, আইনজীবী, বিচারক ও বিচারপতিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

এই সেমিনার আরও বক্তব্য রাখেন প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী সার্কিট জজ ( হাইকোর্ট ডিভিশনে বসার এখতিয়ার সম্বলিত ) যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মহিলা বিচারপতি খাতুন স্বপ্নরা। তিনি বাংলাদেশে বিচার কাজের দীর্ঘ সূত্রিতা কমাতে যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উপর বেশি জোড় আরোপ করেন। তিনি আরও বলেন বাংলাদেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে satellite কোর্ট পরিচালনা, আর্জেন্ট মামলা গুলোকে দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি, এক্স-পার্টি (অন্য পক্ষের অনুপস্থিতিতে) শুনানী পরিচালনা, কেস ম্যানেজমেন্ট শুনানি, রিমোট শুনানি, বিচারকদের ট্রেনিং প্রদান করে ব্যাক  টু ব্যাক মামলা পরিচালনা ও শুনানি সম্পন্ন করা, এবং বিশেষায়িত কোর্ট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা পরিচালনা ও বিচার নিষ্পত্তি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ভিডিওঃ প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী সার্কিট জজ বিচারপতি খাতুন স্বপ্নরার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য 

এই সেমিনার আরো বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্যের ক্রিমিনাল কোর্ট/ক্রাউন কোর্টের বিচারপতি ও রেকর্ডার জন গালাঘার। তিনি ইন্টেরিম এপ্লিকেশনের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিস্পত্তির পক্ষে মত  প্রকাশ করেন।

এছাড়াও অন্যান্য আলোচকগণ বাংলাদেশে দ্রুত বিচার নিস্পত্তি ও মামলার জটিলতা দূরীকরণে কোর্ট রিস্ট্রাকচার (court restructure), আপীলের সময় নির্ধারণ এবং কেউ যাতে নির্ধারিত সময়ের অপব্যবহার করতে না পারে সেই দিকে লক্ষ্য রাখা, অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেসোলিউশনের (ADR) ব্যবহার বৃদ্ধি, রাজনীতির উর্ধে উঠে বিচারকদের ন্যায়-নীতির মাধ্যমে বিচার কাজ পরিচালনা করা, বিচারকদের স্বাধীন ভাবে বিচার কার্য পরিচালনার উপর জোড় দেন, আর বিচারকরা যদি স্বাধীনভাবে বিচার কাজ সম্পাদন করতে পারে তাহলে বাংলাদেশে বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রিতা অনেকাংশে কমে যাবে বলে তারা সেমিনারে মত প্রকাশ করেন।

এসবিএল কর্তৃক আয়োজিত উক্ত সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক অ্যাটর্নি সিনিয়র আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহসম্পাদক ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ ফারুক ও সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান বক্তব্য রাখেন।

পরিশেষে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মো: নুরুল গাফফার সভাপতির বক্তব্য উপস্থাপন করে এবং নিম্ন লিখিত প্রস্তাবনা পেশ করেন –

১. অতি পুরাতন বর্তমান ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং সিভিল প্রসিডিউর ১৯০৮ দ্রুত সংস্কার ও সংশোধন করা

২. বিচার বিভাগের জন্য বাজেট বৃদ্ধি করণ যা এই মুহূর্তে মোট বার্ষিক বাজেটের এক শতাংশেরও কম

 ৩. অধিক বিচারক এবং অন্যান্য সহায়ক অফিসার/কর্মী নিয়োগ

৪. বিচারকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য   আরও অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন নতুন কোর্ট নির্মাণ এবং আদালত সংখ্যা বৃদ্ধি করা

 ৫. আইনজীবীদের সময়পোযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান করা

৬. প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় বই পুস্তক এবং আধুনিক সরঞ্জামাদি ক্রয় করার জন্য আইনজীবীদেরকে সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা

৭. উদ্বেগজনক মামলাগুলি যা বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরী করে তা আদালতে বার বার পুনরাবৃত্তি করা যাতে না হয় সেই দিকে নজরদারি করা

৮. লর্ড উল্ফ কর্তৃক চিহ্নিত আদালতের ব্যয়, বিলম্বতা এবং জটিলতা দূরীকরণে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা

৯. আধুনিক প্রযুক্তির সহজ ব্যবহার নিশ্চিত করা,

১০. বিচারক বৃদ্ধির পাশাপাশি বিচারকদের দক্ষতা ও তাদের সহকারী বৃদ্ধিসহ এবং তাদেরকে আন্তৰ্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান, তাদের গুনগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন, বিদেশী ডেলিগেট কর্তৃক আন্তর্জাতিকমানের সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ও সর্ট কোর্সের আয়োজন করা

১১. বিচার কার্যের দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করনে প্রক্রিয়াগত বাধা ও এর অপব্যবহার দ্রুত নিস্পত্তি করা ১২. বিচার কাজের দীর্ঘ সূত্রিতা নিরসনে, বিচারক, বিচারপতি, কোর্ট অফিসার, আইনজীবী, এবং আদালতের সাথে সংশ্লিট সকলের তদারকি নিশ্চিত করা

১৩. আদালতকে যারা অপব্যবহার করার চেষ্ঠা করে তাদেরকে চিহ্নিত করে এবং বিচারের আওয়তায় নিয়ে আসা, এবং

১৪. আইনজীবী ও ভবিষ্যত বিচারক তৈরিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

বিশ্বব্যাপী মহামারী কোভিড -১৯ সংক্রমণ এবং শত ব্যস্ততার মধ্যেও সেমিনারে উপস্থিত হওয়ার জন্য সকল অংশগ্রহণকারীদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সেমিনারের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলোয়াত করেন ব্যারিস্টার আরিফুল কবির চৌধুরী।


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা