রবিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ রবিবার | ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং

হিপনোসিস ও হিপনোটাইজ করার প্রক্রিয়া কি?

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২০ | ৭:১৮ পিএম | 167 বার

হিপনোসিস ও হিপনোটাইজ করার প্রক্রিয়া কি?

হিপনোসিস একটি কার্যকরী মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এর কার্যকারিতার প্রমান রয়েছে। তবে হিপনোসিস সম্পর্কে আমাদের নানা ভুল ধারনা রয়েছে।

সম্মোহন বলতে বোঝায় কাউকে মানসিকভাবে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যখন সম্মোহিত ব্যাক্তিকে প্রকৃত মানসিক অবস্থা জানা সম্ভব। আসলে মানুষের মনের দুটো পর্যায় রয়েছে, একটি বাহ্যিক মন আরেকটি অন্ত মন। বাহ্যিক মন হচ্ছে আপনার মনে যা আসছে তা আপনি বুঝতে পারেন ও তা করতে পারেন। অন্তমন হচ্ছে আপনার চিন্তারর গভীরতম অংশের ক্ষেত্র। যেখানে আপনি চেতন বা অবচেতন মনের সকল চিন্তা উৎপাদিত হয়। এটা সহজে প্রকাশিত হয় না বা সেকাজ সহজে আপনি করেন না। প্রকৃতপক্ষে অন্তমনের উপর প্রভাব বিস্তার করাকেই সম্মোহন বলে। সম্মোহন যে কেউ করতে পারে। তবে এজন্য চর্চার প্রযোজন পড়ে।

কারো চোখের সামনে হাত বা ফুল নাড়িয়ে কিংবা চোখের তারায় জোরালো আলো ফেলে সম্মোহিত করে তার থেকে তথ্য বা অন্য কিছু হাতিয়ে নেওয়ার দৃশ্য সিনেমা কিংবা নাটকে আমরা দেখেছি। বই বা মনোবিজ্ঞান-বিষয়ক সাময়িকীতে পড়েছি যেকোনো মানুষকে সম্মোহিত করে ইচ্ছামতো যেকোনো কাজ করিয়ে নেওয়ার ঘটনাও।

প্রাচীনকাল থেকেই সম্মোহনবিদ্যা প্রচলিত রয়েছে মানব সমাজে। সেকালে এই বিদ্যাকে জাদুবিদ্যা, বশীকরণবিদ্যা বা অলৌকিক ক্ষমতা বলে মানুষ বিশ্বাস করা হতো। তবে অষ্টাদশ শতকে সম্মোহনবিদ্যার নামকরণ হয় ‘মেজমেরিজম’। অস্টিয়ার ভিয়েনা শহরের ড. ফ্রান্ডস অ্যান্টন মেজমার সম্মোহনবিদ্যার চর্চা শুরু করেন বলে পরবর্তীতে তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘মেজমেরিজম’।

কিন্তু ১৮৪০ সালে স্কটল্যান্ডের আরেক ডাক্তার জেমস ব্রেড এর নতুন নামকরণ করেন। সম্মোহিত ব্যক্তি যেহেতু এক প্রকার ঘুমের ঘোরে কাজ করে যায় তাই তিনি গ্রিকদের ঘুমের দেবতা হুপনসের নামানুসারে এই বিদ্যার নাম দেন হিপনোটিজম।

সম্মোহনবিদ্যাকে (হিপনোটিজম) কলাবিদ্যা বলা যেতে পারে। হিপনোসিস শব্দের অর্থ সম্মোহন। তাই একজনের চরম প্রস্তাবনা, তীব্র আবেগ ও কল্পনাশক্তি দ্বারা অন্যের মনকে প্রভাবিত করা এবং পরিচালনা করাকে বলা হয় হিপনোসিস। আর যে বিদ্যার মাধ্যমে এটি করা হয় তাকে বলে হিপনোটিজম।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর ঘোষ বলেন, সম্মোহন হলো মস্তিষ্কে ধারণা সঞ্চার করা। এর ফলে মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়। তখন যদি সে উত্তেজনার সহনশীলতা ওই ব্যক্তির না থাকে, তবে সে সম্মোহিত হয়।

সম্মোহন মূলত বিজ্ঞানসম্মত একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তার রোগীর কাছ থেকে অবচেতন অবস্থায় বিভিন্ন কথা বের করে আনার চেষ্টা করেন। এর সফলতা রোগীর অবস্থার তারতম্যে পরিবর্তন হতে পারে। পুরো হিপনোসিস প্রক্রিয়ায় রোগী বা যাকে হিপনোসিস করা হচ্ছে তার শরীরে শিথিলতা নেমে আসে। তীব্র কল্পনাশক্তির কারণে একটি অস্বাভাবিক স্বপ্নায়ন মোহগ্রস্তের অবস্থার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে, যা অনেকটা ঘুমের মতো মনে হলেও আসলে কিন্তু ঘুম নয়। কারণ এই হিপনোসিস প্রক্রিয়াটিতে পুরো সময়জুড়ে হিপনোটাইজড ব্যক্তিটিকে সজাগ থাকতে হয়।

হিপনোসিস চলাকালীন মস্তিষ্কের সচেতন অংশকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ওই ব্যক্তির বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোকে কেন্দ্র্রীভূত করা হয় এবং তাকে মানসিকভাবে শিথিল করার দিকে মনোনিবেশ করানো হয়।

আমাদের মন কোনো একটি দিকে নিবিষ্ট হয়, কেন্দ্র্রীভূত হয় তখনই আমরা শক্তি অনুভব করি। যখন কোনো ব্যক্তি সম্মোহিত হয় তখন আমরা তার মাঝে কিছু শারীরিক পরিবর্তন ও লক্ষণীয় হয়। যেমন তার নাড়ির স্পন্দনও কমে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসও কমে যায়। সেই সঙ্গে তার মস্তিষ্কের আলফা স্তরে ঢেউ খেলতে থাকে। এই সময় ওই ব্যক্তিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে বা বিশেষ কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই বিদ্যাকে ব্যবহার করতেন ইংল্যান্ডের ডাক্তার এস ডেল। তিনি সম্মোহনের সাহায্যে রোগীকে ঘুম পাড়িয়ে দাঁত তুলতেন, ছোটখাটো অপারেশনও করতেন।

ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নিযুক্ত একটি কমিটি বিস্তর অনুসন্ধানের পর রায় দেয় যে, হিপনোটিজম একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। এরপর যত দিন এগোচ্ছে, বড় বড় চিকিৎসক-বিজ্ঞানীরা এই বিদ্যাটির উপর অত্যুৎসাহী হয়ে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে আসছেন। বর্তমানে এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, হিপনোটিজম একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

অনেকেরই একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, প্রবল ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষকে হিপনোটাইজ করা যায় না। মূলত সব মানুষকেই হিপনোটাইজ করা সম্ভব। মোটামুটিভাবে কোনো জনসংখ্যার ৯০ শতাংশকে হিপনোটাইজ করা যায়। বাকিদের ক্রমশ উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিপনোথেরাপিতে অভ্যস্ত করে তোলা যায়। হিপনোথেরাপি পদ্ধতি খুব সহজ। অবশ্য হিপনোথেরাপির আসল জোর মোটেই পদ্ধতিতে নয়, সাজেশনে। হিপনোথেরাপির উদ্দেশ্য কাউকে হিপনোটাইজ করা নয়, রোগীকে তার সমস্যা থেকে উদ্ধার করা। হিপনোথেরাপি হলো ‘প্রোগ্রামিং অব সাবকনসাস মাইন্ড’ যা সমস্যার মূলে সরাসরি আঘাত হানতে পারে। তবে সাজেশন ঠিকঠাক হওয়া বাঞ্ছনীয়।

হিপনোসিস বা সম্মোহনকে কেন্দ্র করে অনেক ধরনের অসুখ-বিসুখ সারানো সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে। অনেক বিজ্ঞানী আবার একে এমনই এক ধরনের বিদ্যা বলে আখ্যায়িত করছেন, যার মাধ্যমে যেকোনো অসুখ শুধু সারানো নয়, একেবারে নির্মূল করাও সম্ভব হয়! অনেক হিপনোটিস্ট বা হিপনোথেরাপিস্টের দাবি, বিদ্যাটি ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারলে আর্থ্রারাইটিস, হাইপারথাইরয়েডিজম থেকে শুরু করে অ্যাজমা, ক্রনিক হজমের সমস্যা, মদ বা ধূমপান অভ্যাস, বন্ধ্যত্ব, স্ট্রোকের ফলে হওয়া পঙ্গুত্ব, দুশ্চিন্তা, মাইগ্রেন, বাত বা ক্যানসারের যন্ত্রণা, অনিদ্রা, ফোবিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি সমূলে মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব।

প্রায় ২০০ বছরেরও অধিক সময় ধরে লোকজন হিপনোসিস বা সম্মোহন নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে আসছে। এই বিষয় নিয়ে রয়েছে হাজারো তর্ক-বিতর্ক। কীভাবে সম্মোহন করা হয় তা নিয়ে একটি ধারণা পাওয়া গেলেও ঠিক কী কারণে সম্মোহিত হয়, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো বিজ্ঞান দিতে পারেনি। মানুষের মন আসলেই একটি জটিল জায়গা। কী দেখে ভালো লাগে? কিসে প্রেমে পড়ে? কিসে বিপথে যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। মানুষ আপন মনে তার মনকে নিয়ে খেলে। তাই তো এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই আলাদা। আলাদা তাদের চিন্তা ভাবনা, ধ্যান ধারণা। এই মনকে নিয়েই তাই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই চলে আসছে হিপনোসিস বা সম্মোহনের খেলা।

একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার সাথে থাকা বন্ধুটি আপনার ব্যাপারে এমন অনেক গোপনীয় কথা জানে, যা আপনি কখনোই কারও কাছে প্রকাশ করেননি এবং কোনভাবেই তার জানতে পারার কথা না।

যদি আপনি নিশ্চিত হয়ে থাকেন যে এ কথা কখনোই আপনি সজ্ঞানে কাউকে বলেননি কিন্তু তাও কেউ জেনে গেছে তাহলে বুঝে নিতে পারেন আপনাকে সম্মোহন করা হয়েছে এবং আপনার অজান্তেই আপনার কথা জেনে নেয়া হয়েছে।

সম্মোহনবিদ্যাকে (Hypnotism –হিপনোটিজম) এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিদ্যা বলা যেতে পারে। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ সিনেমার একটি দৃশ্যে আমরা দেখেতে পাই অন্ধকার ঘরে ছোট্ট মুকুলের চোখে টর্চের আলো ফেলে নকল ডাক্তার হাজরা তাকে সম্মোহিত করে সোনার কেল্লা কোথায় তার হদিস জেনে নিচ্ছে।

এই ভাবে সম্মোহন বিদ্যার সাহায্যে সম্মোহনকারী সম্মোহিত ব্যক্তির কাছ থেকে যে কোনও খবর জেনে নিতে পারে। এমনকী তাকে দিয়ে ইচ্ছা মত নানা কাজও করিয়ে নেওয়া যায়। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে সম্মোহন থেকে ফেরার পর তার কিছুই মনে থাকবে না যে সে কি বলেছে বা করেছে।

তীব্র আবেগ ও কল্পনা শক্তি দ্বারা অন্যের মনকে প্রভাবিত করা এবং পরিচালনা করাকে বলা হয় হিপনোসিস। প্রাচীনকাল থেকেই সম্মোহন বিদ্যা প্রচলিত রয়েছে মানব সমাজে। সে কালে এই বিদ্যাকে যাদুবিদ্যা বা অলৌকিক ক্ষমতা বলে মানুষ বিশ্বাস করত। অষ্টাদশ শতকে সম্মোহন বিদ্যার নামকরণ হয় ‘মেজমেরিজম’ অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের ডাক্তার ফ্রাণ্ডস্‌ অ্যান্টন মেজমার সম্মোহন বিদ্যার চর্চা শুরু করেন। ফলে এর ব্যাপক প্রচার শুরু হয় এবং ডাক্তারের নামানুসারে সবাই একে ‘মেজমেরিজম’ বলতে থাকে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই বিদ্যাকে প্রথম কাজে লাগান ইংল্যাণ্ডের ডাক্তার এস ডেল। তিনি সম্মোহনের সাহায্যে রোগীকে ঘুম পাড়িয়ে দাঁত তুলতেন, ছোটখাট অপারেশনও করতেন।

হিপনোটাইজড অবস্থায় মানুষের এমন অনেক ঘটনার কথা মনে পড়ে যার পুরোটাই তার ‘ফলস মেমারি’। যা তার অবচেতন মনে লুকায়িত ছিল। তা বলে ফেলার পর মন হালকা হয়ে যায় এবং সেই মানুষ মানসিক ভাবে সুস্থ হয়ে যায়।

হিপনোটিক থেরাপি চিকিৎসাক্ষেত্রে শরীর ও মনের রোগ সারানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। একে ‘অলটারনেটিভ সায়েন্স বা অলটারনেটিভ থেরাপি’ বলা হয়ে থাকে। সম্মোহনচর্চা জানলে তা প্রয়োগ করে আর্থ্রারাইটিস, হাইপারথাইরয়েডিজম থেকে শুরু করে অ্যাজমা, ক্রনিক হজমের সমস্যা, মদ বা ধূমপান অভ্যাস, বন্ধ্যাত্ব, স্ট্রোকের ফলে হওয়া পঙ্গুত্ব, অ্যাংজাইটি, মাইগ্রেন, বাত বা ক্যানসারের যন্ত্রণা, অনিদ্রা, ফোবিয়া, উচ্চরক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি এসব সমস্যার সমাধান করা যায়।

মানুষের মস্তিষ্কের থেকে শক্তিশালী কিছু নেই। সেক্ষেত্রে তার মানসিক ইচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে অনেক রোগই ভাল করা যায়। হিপনোসিসের মাধ্যমে সেটা বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্ভব।

শুধুমাত্র কথা বলে লোককে হিপনোটাইজ করে শারীরিক স্থূলতার মতো সমস্যার সমাধান করতে পারেন একজন হিপনো বিশেষজ্ঞ। কথার মাধ্যমে হিপনোটাইজ করে তিনি রোগীর মাথায় এমন একটি ধারণা ঢুকিয়ে দেন যে, তার মনে হতে থাকে যে পাকস্থলীটা ছোট হয়ে গিয়েছে। যেমন অনেকটা বেরিয়াট্রিক সার্জারি করালে হয়। এর ফলে তার ওজন কমে।

কিভাবে করা হয় এই সম্মোহন-

এটি কোন ধরনের জাদু বিদ্যা না। সম্পূর্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়। হিপনোসিস চলাকালীন সময়ে মস্তিষ্কের সচেতন অংশকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে ঐ ব্যক্তির বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং তাকে শিথিল করার দিকে মনোনিবেশ করা হয়।

যখন আমাদের মন কোন একটি নির্দিষ্ট দিকে নিবিষ্ট হয়, কেন্দ্রীভূত হয় তখনই আমরা শক্তি অনুভব করি। যখন কোন ব্যক্তি সম্মোহিত হয় তখন তার মাঝে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন তার নাড়ীর স্পন্দন কমে যায়, শ্বাস প্রশ্বাসও কমে যায়। সেই সাথে তার মস্তিষ্কের আলফা স্তরে ঢেউ খেলতে থাকে। এই সময়ে ঐ ব্যক্তিকে কোন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে বা বিশেষ কোন নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সম্মোহিত করার ধাপগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়।

১। সম্মোহনের জন্য তৈরি করা-

এমন কাউকে বেছে নিতে হবে যে সম্মোহিত হতে চায়। এর অন্যথা হলে সম্মোহন করা বেশ কষ্টসাধ্য। এতে যে তার কোন ক্ষতি হবে না তাও নিশ্চিত করতে হবে। কেননা এই ব্যাপারটা সম্পূর্নভাবে মানসিক। সম্মতি না থাকলে সাব-কনসাস মাইন্ড তাকে সম্মোহিত হতে দিবে না। যার পূর্বে মানসিক ডিসঅর্ডার এর রেকর্ড আছে তাদের সম্মোহন না করাই ভাল। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

২। অধিষ্ঠায়ন

এটি এমন একটা প্রক্রিয়া, যে ব্যক্তিকে সম্মোহিত করা হবে তার স্নায়ুকে শিথিল করে দিতে হবে। এখানে সম্মোহনকারীকে থাকতে হবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, অবিচল এবং কোমল। আর অবশ্যই তার সকল আদেশ নির্দেশ হতে হবে ইতিবাচক। আরাম চেয়ারে বসিয়ে বা শুইয়ে দিয়ে তাকে এমন কিছু নির্দেশ দিতে হবে। যেমনঃ হাত দুটো আরাম করে কোলের উপর রাখো……এখন তাকাও আমার হাতের দিকে। ছোট আঙ্গুলের/চেইনটির/মাঝের বিন্দুটির দিকে তাকাও… তাকিয়ে থাকো….. নিশ্বাস নাও ……. অনেক জোরে নিশ্বাস টেনে নাও বুক ভরে….. নিঃশ্বাস ধরে রাখো… এবার ছাড়ো।

৩। গভীরে নেয়া

দ্বিতীয় অংশটুকুর মাঝেই এই ধাপটি আসে। সম্মোহনকারী পারিপার্শ্বিক কিছু যুক্ত করে অন্য রকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। সম্মোহিত ব্যক্তির খুব পছন্দের কোন গান চালিয়ে তাকে কাল্পনিক ভাবে তার প্রিয় কোন স্মৃতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্রমেই তাকে ঐ মুহুর্তের গভীরে নিয়ে যেতে হবে। যেন তার কাছে মুহুর্তটি বাস্তব বলে মনে হয়। সন্মোহনকারীর প্রতিটা কথায় বাক্যে বা নির্দেশে সন্মোহিত ব্যাক্তি চলে যাবে আরও শিথিলতায়। প্রতিটি নিঃশ্বাস তাকে নিয়ে যাবে আরও গভীরে। ব্যক্তি যত গভীরে প্রবেশ করবে তাকে সম্মোহন করার ক্ষমতা ততটাই সম্মোহনকারীর হাতে চলে আসবে।

৪। অভিভাবন

সম্মোহিত ব্যাক্তির হাতের দুটি আঙ্গুল এক এক করে ধরে হালকা চাপ দিয়ে যদি তাকে বলা হয় তোমার দু’আঙ্গুল জুড়ে দেয়া হয়েছে যাদু দিয়ে এখন দু আঙ্গুল একসাথেই লেগে থাকবে। বলা যাবে না তুমি আর আঙ্গুল দুটো খুলতে পারবে না। অর্থাৎ কখনো নেতিবাচক বা না শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না। তাহলে অবচেতন মন সচেতন হয়ে যাবে আর না শব্দটি গ্রহণ করবে না। ফলে সম্মোহন কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ধীরে ধীরে বলতে হবে যাদুর আঠায় তোমার আঙ্গুল আরো বেশী জোড়া লেগে যাচ্ছে। যখন সে আর খুলতে পারবে না তখন বলতে হবে আমি এক, দুই, তিন (অপেক্ষাকৃত জোরে) বলার সাথে সাথে তোমার আঙ্গুলের জোড়া খুলে যাবে। গভীরতা বাড়ানোর জন্য বলা যেতে পারে ১০ থেকে ০ পর্যন্ত গুণব।

প্রতিটি সংখ্যার সাথে সাথে তুমি আরো ২ গুন গভীরে চলে যাবে। ১০, ৯, ৮, ৭ এভাবে ধীরে ধীরে গুনতে হবে। সন্মোহিত ব্যাক্তির হাতে কল্পনায় গ্যাস বেলুন বেধে দিয়ে বলা যায় যে হাত হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। বেলুন উপরে উঠে হাত উপরে উঠিয়ে নেবে আরও ৫০/৬০টা বেলুন বেধে দিয়ে আরও হাল্কা করে দেয়া যায় হাত যত উপরে উঠবে বলতে হবে তোমার হাত হালকা হয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে আর তুমি ভালো ফিল করছো।

যত চাচ্ছো তত উপরে উঠছে হাতটা। ঠিক যেন আকাশে উড়ছো তুমি। এ সময়ে ব্যক্তির মন অত্যন্ত হালকা অবস্থায় থাকবে। তাকে এ অবস্থায় যে কোন কিছু বিশ্বাস করানো যায়। তাকে যদি বলা হয় তুমি একেবারে সুস্থ, তোমার কোন রোগ নেই কিংবা তার জীবনের কোন দুঃখজনক ঘটনা তার জীবনে ঘটেনি বলে বিশ্বাস করালে সে এই ধারনা নিয়েই সম্মোহন থেকে জেগে উঠবে।

৫। জাগিয়ে তোলা

সম্মোহন থেকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসার জন্য বলতে হবে, আমি ১ থেকে ৫ পর্যন্ত গুনব আর ৫ বলার সাথে সাথে তুমি জেগে উঠবে। তখন তোমার অনেক ভালো লাগবে এবং তুমি অনেক হালকা বোধ করবে।

খুব ভালো একটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর তোমার যেমন চনমনে লাগে ঠিক তেমনি। তুমি হবে একজন সুখী মানুষ, ঠিক যেমনটা তুমি হতে চেয়েছিলে। এবার ১ থেকে ৫ পর্যন্ত গোনা শেষ হলেই সম্মোহিত ব্যাক্তি সন্মোহন কেটে জেগে উঠবে।

হিপনোথেরাপির উদ্দেশ্য কাউকে হিপনোটাইজ করা নয় বরং রোগীকে তাঁর সমস্যা থেকে উদ্ধার করা। হিপনোথেরাপি হল প্রোগ্রামিং অফ সাবকনসাস মাইন্ড। এটা অনেক দ্রুত কাজ করে, যা কিনা সমস্যার মূলে সরাসরি আঘাত করতে পারে। তবে অভিভাবন ঠিকঠাক না হলে মনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

কারো কারো ক্ষেত্রে একটি-দুটি অতিরিক্ত শব্দ গ্রহণ বা বর্জন সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। অতএব যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত হিপনোথেরাপিস্ট ছাড়া অন্য কারও কাছে থেরাপি নেওয়া উচিত নয়। বহু রকমের অসুখ-বিসুখ সারানো সম্ভব হিপনোথেরাপির মাধ্যমে।

সারানো যায় বললে কম বলা হয়, বলা যায় একেবারে নির্মূল করা যায়, তাও বিনা ঔষধে। ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিয়ার গঠনেও হিপনোথেরাপি ভালো কাজ করে। এছাড়াও পড়াশোনায় অমনোযোগ, অনিদ্রা, স্থূলতা, ডিপ্রেশন, রাগ কমানো, ক্ষুধামন্দা এসবের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা পদ্ধতির হিপনোটাইজ থিওরি।

আশা করছি বিস্তারিত বুঝতে পারছেন। এবং এই উওরটি আপনাকে কিছু হলেও সাহায্য করবে।

সূএ: ডেইলি বাংলাদেশ


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা