শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ শনিবার | ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

কাশ্মীর: খবর সংগ্রহে যেভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪:৩৪ পিএম | 63 বার

কাশ্মীর: খবর সংগ্রহে যেভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন

ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাংবাদিকদের জন্য খবর সংগ্রহের কাজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সেখানে সম্প্রতি সাংবাদিকদের মারধর, হেনস্থা ও গ্রেফতারের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে তাতে সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন।

সাংবাদিকদের হেনস্থা আর মারধরের ঘটনা ঘটছে প্রায়শই। সাংবাদিকরা বলছেন অনেক সময়ই কেন তাদের মারধর করা হচ্ছে তা বুঝতেও তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

গতবছর ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকে কাশ্মীরে নিরাপত্তাবাহিনীর কড়াকড়ি আরও বেড়েছে। নিয়মিতই সাংবাদিকদের থানায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে, খবরের সূত্র জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন।

শ্রীনগরে বিবিসি-র সহযোগী সাংবাদিক মজিদ জাহাঙ্গীর বলছেন, “শুধু খবরের সূত্রই নয়, কখনও খবরটার কেন প্রকাশ করা হল সেটাও যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হয়। কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে – যার মধ্যে একজন নারী সাংবাদিকও আছেন,” বলছিলেন তিনি।

জুন মাসে সরকার এক নতুন গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরি করেছে, যাতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে খর্ব হচ্ছে বলেও তিনি বলছেন।

গত মঙ্গলবারও নিরাপত্তাবাহিনী ও উগ্রপন্থীদের মধ্যে এক বন্দুকযুদ্ধ চলাকালীন সেই ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের লাঠি – লাথি আর গালিগালাজ খেয়েছেন এক সাংবাদিক। কামরান ইউসুফ নামের ওই সাংবাদিক বলছেন পুলওয়ামার ওই বন্দুক যুদ্ধের খবর জোগাড় করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অকারণে তাকে মারা হয়েছে।

ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাংবাদিকদের হেনস্থা আর মারধরের সাম্প্রতিকতম ঘটনাটি ঘটে, যখন পুলওয়ামায় নিরাপত্তাবাহিনী ও উগ্রপন্থীদের মধ্যে একটি চলমান বন্দুকযুদ্ধের খবর সংগ্রহে গিয়েছিলেন সাংবাদিকরা।

মি. ইউসুফ বলছেন, তাকে হঠাৎই নিরাপত্তাবাহিনীর অনেক সদস্য মিলে ক্রমাগত লাঠি দিয়ে মারতে থাকেন। একইসঙ্গে চলে লাথি, চড়-থাপ্পড় – গালিগালাজ। কোনমতে সেখান থেকে পালিয়ে এক হাত দিয়ে গাড়ি চালিয়ে শ্রীনগরে হাসপাতালে পৌঁছন তিনি।

কামরান ইউসুফকে পুলিশের মারধরের ভিডিওর স্ক্রিন গ্র্যাব

বিবিসির কাছে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কামরান ইউসুফ বলেন, “মঙ্গলবার খুব ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি পুলওয়ামার মারওয়াল গ্রামে পৌঁছই, যেখানে বন্দুকযুদ্ধ চলছিল। রাস্তায় গাড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরে আরও বেশ কয়েকজন সহ-সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহককে দেখতে পেয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে যাই, কয়েকটা ছবিও তুলি।

“হঠাৎই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য এসে আমাদের সরে যেতে বলেন। যখন আমরা দূরে সরে যাচ্ছি তখনই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের কয়েকজন অফিসার ও পুলিশ কর্মীরা থামতে বলেন। সঙ্গী সাংবাদিকরা সরে গেলেও আমাকে তারা ধরে ফেলে পেটাতে থাকে। কেন যে তারা মারছে, সেটা বোঝার অবকাশও পাই নি, শুধু মনে হচ্ছিল যে আমাকে মেরেই না ফেলে,” জানাচ্ছিলেন কামরান ইউসুফ।

তাকে যে মারা হচ্ছে, তা দূর থেকে দেখে মি. ইউসুফের দেওয়া ঘটনার বর্ণনা একেবারে সঠিক বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন ওখানে হাজির আরও কয়েকজন সাংবাদিক।

কাশ্মীর এডিটার্স গিল্ড সহ সেখানকার প্রবীণ সাংবাদিকরা এই ঘটনার নিন্দা করে দোষী পুলিশ কর্মীদের শাস্তির দাবি তুলেছে।

পুলিশ বলছে ওই সাংবাদিক বন্দুক যুদ্ধের জন্য যে জায়গা ঘেরা ছিল, তার ভেতরে চলে গিয়েছিলেন এবং তাকে সরে যেতে বলা হলে তিনি পুলিশের সঙ্গে অশান্তি করেন।

যদিও পুলিশের এই বয়ানকে একেবারে অসত্য বলে জানিয়েছেন মি. ইউসুফ।

কামরান ইউসুফ

রাজ্য পুলিশের মহা-নির্দেশক দিলবাগ সিং অবশ্য এই ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

কাশ্মীরের সাংবাদিকরা জানাচ্ছেন নিয়মিতই সাংবাদিকদের মারধর, হেনস্থা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

পুলিশ প্রশাসন যেমন হেনস্থা করে, তেমনই বিক্ষোভকারী জনতা থেকে শুরু করে উগ্রপন্থীদের দিকে থেকেও তাদের ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে।

সাংবাদিক মজিদ জাহাঙ্গীর বলছিলেন, “আপনারা কলকাতা বা দিল্লিতে সাধারণত যেভাবে খবর যোগাড় করেন, আমাদের একেবারে অন্যভাবে কাজ করতে হয়। নিরাপত্তাবাহিনী – বিক্ষোভকারী বা যাদের নন স্টেট অ্যাক্টর্স বলা হয় – সবদিক থেকেই আমাদের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়।”

তিনি বলছেন যবে থেকে এখানে উগ্রপন্থী কার্যকলাপ শুরু হয়েছে তার পর থেকে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা অবধি করা হয়েছে।

জুন মাসে সরকার এক নতুন গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরি করেছে, যেটা একপ্রকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল।

মি. জাহাঙ্গীরের কথায়, “নতুন ওই নীতিমালা অনুযায়ী সরকার ঠিক করে দেবে কোনটা ভুয়া খবর, কোনটা দেশ বিরোধী খবর – সেই অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমকে চলতে হবে। কোভিডের জন্য সাংবাদিকরা হয়তো রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে পারেননি, কিন্তু এটা নিয়ে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে।”

যদি নতুন গণমাধ্যম নীতি তৈরি করতেই হত তাহলে সম্পাদকদের এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিৎ ছিল সরকারের বলে মনে করেন মি. জাহাঙ্গীর।

যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে - তাদের মধ্যে এই নারী সাংবাদিকও আছেন
ছবির ক্যাপশানঃ যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে – তাদের মধ্যে এই নারী সাংবাদিকও আছেন

“ওই নীতিমালা চালু হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকদের মধ্যে সবসময়ে একটা চিন্তা থাকছে যে কোনও ঘটনার খবর ছাপাবেন না কি না ছাপানোই উচিৎ হবে। খবরটা কীভাবে করা উচিৎ হবে — এসবই ভেবে তবে খবর লিখতে হচ্ছে। এদিক ওদিক হলেই আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। আবার কাশ্মীর থেকে সত্য খবরটা পাঠানোরও একটা দায়িত্ব থাকে সাংবাদিকদের- এই দোলাচলে সবসময়ে থাকতে হচ্ছে সবাইকে,” জানাচ্ছিলেন মজিদ জাহাঙ্গীর।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাংবাদিকদের হেনস্থার ঘটনাগুলিকে নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে ২০১৯ এর ৫ অগাস্টের পর থেকে অন্তত ১৮ জন সাংবাদিকের ওপরে শারীরিক হামলা, হেনস্থা বা হুমকির ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে তারা।

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে যে ওই অঞ্চলে সরকারের কাজকর্মের রিপোর্টিং একটি বিশেষভাবে করা হোক – এটাই চায় প্রশাসন। বিবিসি


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা