শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ শনিবার | ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

ভবিষ্যত মোকাবিলায় জন্য বাংলাদেশের ভাবনা

পেঁয়াজকাণ্ডে ‘বেকায়দায়’ কি ভারত?

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮:৩৭ পিএম | 85 বার

পেঁয়াজকাণ্ডে ‘বেকায়দায়’ কি ভারত?

পেঁয়াজ নিয়ে এবার বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত। সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট ও দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে দেশটি পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। এদিকে রপ্তানি না করায় জোগান বেড়ে যাওয়ায় ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে।

এ ছাড়া ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিক্ষোভ করেছেন ভারতের কৃষকরা। একই দাবি তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এ ঘটনাকে বাংলাদেশও ভালোভাবে নেয়নি । আনুষ্ঠানিকভাবে নোট দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ভারতের একমাত্র প্রতিবেশী বাংলাদেশ যার সঙ্গে দেশটির সুসম্পর্ক রয়েছে আর পেঁয়াজকাণ্ডে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টির জন্যে অনুতপ্ত হয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

অন্যদিকে কোরবানির ঈদের আগে ভারত গরু পাঠানো বন্ধ করে দিলে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। তবে সে ধকল কাটিয়ে উঠে এখন দেশের খামারিরা স্বাবলম্বী হয়েছেন। এরপর পুরনো পথেই হাঁটছে ভারত, তবে সঙ্গী এবার পেঁয়াজ। পেঁয়াজকাণ্ডেও ভারতকে মোকাবিলার কথা ভাবছে বাংলাদেশ, যেভাবে গরু সংকটে মোকাবিলা করা হয়েছিল।

ভারতের কাছে দেন-দরবার চেয়ে কোনো লাভ হয় না, এটা এখন সবার জানা। তাই ভারত যেভাবে চাপ সৃষ্টি করে সেই বিষয়ে স্বাবলম্বী হয়ে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করার কৌশলই হলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ভালো উপায় বলে মনে করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। বেশি দিন আগের কথা না, এক যুগ আগেও ভারতের গরুর ওপর বাংলাদেশের কোরবানি নির্ভর করত। প্রতি বছর কোরবানি এলেই ভারত গরু দেবে কি দেবে না— এই নিয়ে শঙ্কা দ্বিধা এবং আতঙ্ক কাজ করত। মাঝে মাঝেই ভারত বাংলাদেশের গরু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত, অযাচিত কারণে। ফলে বাংলাদেশের কোরবানিতে সংকট দেখা দিত।

আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই দেখব, ২০০৪-০৬ সালে ঈদুল আজহায় বাংলাদেশে কোরবানির গরুর সংকট দেখা দিয়েছিল ভারতের অযাচিত সিদ্ধান্তের কারণে। সে সময় ভারত বাংলাদেশে গরু প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল এবং সীমান্তগুলোতে কঠোর নজরদারি রেখেছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে দিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে গরুর উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে আলাদা নজর দেয়া হয়। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরদারির মধ্যে ছিল। সারা দেশে ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় খামার তৈরি করা, পশু পালনে উৎসাহি করা প্রণোদনা দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত তদারকি শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীকে বেগম মতিয়া চৌধুরী কীভাবে গরুতে স্বাবলম্বী হওয়া যায় সে ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর এসব পরামর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তার ফলে বাংলাদেশে একটি নীরব গরু বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে।

গত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে কোরবানির জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ এ বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছে, বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধের প্রেক্ষিতে ভারতের প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার কোটি রুপি ক্ষতি হচ্ছে। কারণ শুধু কোরবানি নয়, প্রতিদিনের আমিষের চাহিদা মেটাতেও ভারতের গরুর ওপর নির্ভর ছিল বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময়ে কারণে-অকারণে গরু রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশকে।

২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশ পশু উৎপাদনে আস্তে আস্তে স্বাবলম্বী হয়ে উঠে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম ঘোষণা করে যে, বাংলাদেশে কোরবানি বা প্রাণীজ আমিষের চাহিদা জন্য ভারতীয় গরুর দরকার নেই। বাংলাদেশই এখন কঠোরতা আরোপ করছে সীমান্তগুলোতে। কারণ বাংলাদেশের দেশীয় খামারিরা যেন তাদের পশুর ন্যায্যমূল্য পান, সেটি নিশ্চিত করার জন্যই সীমান্ত অঞ্চলে এখন বাংলাদেশই উল্টো কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ভারতের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ভারতের গরুর চাহিদা কমে যাওয়ায় ভারতের গো-ভবিষ্যৎ সংকটে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিশেষ করে বলদ, ষাঁড়গুলো বয়স শেষ হলে বা পশু মৃত্যুর পর তাদের যথা বিহিত ব্যবস্থা করা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এটি করতে গিয়ে ভারতকে বছরে প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে। কারণ, ভারতের আইন অনুযায়ী গরু জবাই নিষিদ্ধ। এ রকম বাস্তবতায় ভারত এখন গরু নিয়ে উল্টো বিপদে পড়েছে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে গিয়ে। একই রকম অবস্থা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার প্রথম দফায় পেঁয়াজের পরই বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বাবলম্বী করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এবার প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী হিসেবে আছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। আর এই বাস্তবতায় সারাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রণোদনা এবং পেঁয়াজের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ যেন পেঁয়াজ উৎপাদন করে। সে সঙ্গে পেঁয়াজের মজুত এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কৃষি মন্ত্রণালয় এখন এটি নিয়ে কাজ করছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, হয়তো এক বছর কিংবা সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ পেঁয়াজে স্বাবলম্বী হবে। তখন ভারতের পেঁয়াজের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে হবে না। পেঁয়াজে বাংলাদেশ ভারতকে গরুর শিক্ষাই দেবে। বাংলাদেশের একটা অদ্ভুত বিষয় হলো যে, বাংলাদেশ যখন কোন একটা সংকটে পরে সেই সংকট থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নেয়। শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। গরুর পর পেঁয়াজ নিয়ে বাংলাদেশ এখন যে সংকটে পড়েছে। সেই সংকট থেকে বাংলাদেশ নিজেকে স্বাবলম্বী করেই সংকট মোকাবিলা করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও কৃষিবিদরা।

এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশীদ বলেন, ‘বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। সে দেশের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজের দাম পড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে পেঁয়াজ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন দেশটির ব্যাঙ্গালোর, নাসিক, ইন্দোর অঞ্চলের কৃষকরা ইতোমধ্যেই বলেছেন, পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু করেন, তা না হলে তারা ভারতের বাজারেই পেঁয়াজ বিক্রি করবেন না। হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশীদ বলেন, ‘এসব কারণে আমরা আশা করছি, কৃষকদের সেই বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এমনও হতে পারে, ইচ্ছা থাকলেও খুব বেশি দিন তারা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখতে পারবে না। পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে হতে পারে। খুব কম সময়ের মধ্যে আবারও পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু হতে পারে বলেও আমরা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে জেনেছি।’

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও জানান, ভারত সরকার গত সোমবার থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় শুধু হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারকদের ২৫০ ট্রাক পেঁয়াজ দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় লোডিং অবস্থায় ভারতের বিভিন্ন সড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোডিং থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ৯-১০ দিন পার হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে এসব পেঁয়াজে পচন ধরতে শুরু করেছে। এমন অবস্থায় আগামী দু-একদিনের মধ্যে এসব পেঁয়াজ রপ্তানি না করলে, আমরা আমদানিকারকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। একই সঙ্গে আমাদের যে ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি দেয়া হয়েছিল, তার কার্যক্রমও স্থগিত রেখেছেন তারা।


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা