শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ শনিবার | ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

বাসায় ৪০ লাখ টাকা যা বললো পুলিশ

যেকারনে ও যেভাবে ইউএনওর ওপর হামলা করেছিলো রবিউল

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪:১৭ পিএম | 58 বার

যেকারনে ও যেভাবে ইউএনওর ওপর হামলা করেছিলো রবিউল

ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবন শাপলা থেকে ৪০ লাখ টাকা, ৫ হাজার ইউএস ডলার ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধারের খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে তার পরিবার, পুলিশ ও প্রশাসন।

এদিকে এমন সংবাদকে মনগড়া বলে উল্লেখ করেছে ইউএনও’র পরিবার। আর এ ধরণের সংবাদ প্রচার করে ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে ঘটনাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য কেউ ষড়যন্ত্র করছে বলে দাবি প্রশাসনের।

মামলার বাদী ইউএনও ওয়াহিদার বড় ভাই শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমার বোনকে এক কাপড় পরেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার বোন নিজেই আমাকে বলেছিল আলমারি থেকে পুরাতন কাপড় নিয়ে যেতে। আবার নতুন কাপড় সেলাই করতেও ঝামেলার। তাই আলমারি থেকে আমার বোনের ব্যবহৃত পুরাতন কাপড় নিয়ে যাই। টাকা পয়সা, ইউএস ডলার এসব কিছুই ছিল না। আমি এসবের কিছু জানিও না!’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘোড়াঘাট থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, ‘টাকার প্রশ্ন কেন আসবে? এত টাকা কি কেউ বাড়িতে রাখে? আপনারা হলে এত টাকা বাড়িতে রাখতেন? আর আমরা তো টাকা দেখিনি। শুধু পুরাতন কাপড় তার ভাই বের করে নিয়ে গেছে। টাকা পয়সার কথা যারা বলছেন তারা কিভাবে জেনেছেন আমাদের জানা নেই।’

বিরামপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিথুন সরকার বলেন, ‘আমরা শুধু আলমারির চাবি ইউএনওর ভাইকে দিয়েছিলাম। টাকা পয়সার প্রশ্নই আসে না।’

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। কে কিভাবে প্রচার করেছে আমরা জানি না।’

জানতে চাইলে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, ‘ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও এর সাথে পরিকল্পনাকারীকে আড়াল করার জন্য একটি গোষ্ঠী চেষ্ঠা চালাচ্ছে। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলায় দেশবাসী যে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন, সেই দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নেয়ার জন্য একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে।’

জেলা প্রশাসক আরোও বলেন, ‘আমার যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বক্তব্য দিয়েছে সেখানে কোথাও টাকার কথা উল্লেখ নেই। বিষয়টাকে কে কিভাবে ছাড়াচ্ছে আমরা সেটাও জানি না। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন ইউএনওর ভাই। যদি তিনি টাকা নিয়ে থাকেন তাহলে বলুক। কিন্তু তিনিও তো জানেন না এই টাকা, ডলারের কথা। ইউএনওর বিষয়ে কেউ কেউ মিথ্যাচার চালাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’

যেকারনে ও যেভাবে ইউএনওর ওপর হামলাঃ

ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার ঘটনায় মূল হামলাকারী তারই বাসভবনের মালি (বহিষ্কৃত) রবিউল ইমলাম ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যা বলেছেন তা একটি সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে!

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলার তদন্তের সাথে জড়িত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। রবিউলের বক্তব্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার সবকিছুই যেন একসাথে মিলে যায়। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত এই ঘটনার সাথে একজনই জড়িত। তথ্য প্রমাণাদি বিশ্লেষণে এমন বিষয়টি দাবি করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তার দেয়া তথ্যমতে আলমারির চাবি, হাতুড়িসহ বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের নিকট রবিউল বলেছেন, একদিকে পারিবারিক অশান্তি, অন্যদিকে ইউএনও’র ১৬ হাজার টাকা চুরির অপরাধে সাময়িক বরখাস্ত। সব মিলিয়ে মনের মধ্যে অনেক দিন ধরে চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ায় ইউএনওকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। নিজস্ব পরিকল্পনা থেকেই গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) নিজ বাড়ি বিরল উপজেলার বিজোড়া গ্রামের ধামাহার ভিমরুলপাড়া থেকে বিকাল ৪টার দিকে ঘোড়াঘাটের উদ্দেশ্যে বের হন।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি যাত্রীবাহী বাসে উঠে ঘোড়াঘাটে পৌঁছে যান রবিউল। তখন রাত সাড়ে ৯টা হবে। এরপর ঘোড়াঘাট বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত যখন ১টা বাজে তখন ইউএনওর বাসর দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন ইউএনওর বাসভবনের চারদিক শুধুই নীরবতা।

জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল বলেন, ‘প্রথমে নৈশ্যপ্রহরী নাদিম হাসান পলাশের কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। তার কক্ষে ইউএনও’র বাসভবনের কেচিগেট ও মেইন গেটের তালার চাবি থাকে। পলাশের রুমে চাবি খুঁজতে থাকি। চাবি না পাওয়ায় পলাশের কক্ষ থেকে বের হয়ে পরিত্যক্ত কাঠ রাখার ঘরে কাছে গিয়ে একটা চেয়ার ও মই নিয়ে ইউএনও’র বেডরুমে ঢুকে হত্যার পরিকল্পনা করি।‘

‘সেই পরিকল্পনা অনুসারে একটা চেয়ার ও মই নিয়ে আসি। ভেন্টিলেটার দিয়ে ঘরে প্রবেশ করার জন্য মই সেট করি। মই দিয়ে ওয়াল বেয়ে ভেন্টিলেটার খুলে ভুলবশত রুমে না গিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করি। বাথরুমে ঢুকে দেখা যায় দরজা বাহির থেকে আটকানো। তাই ইউএনও’র বেডরুমে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই বাথরুমেই প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করি, যদি ইউএনও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাথরুমে আসে তাহলে এখানেই তাকে ধরা হবে।’

রবিউল বলেন, ‘এক থেকে দেড় ঘণ্টা বাথরুমে অপেক্ষা করারও পরও যখন ইউএনও বাথরুমে আসেনি, তখন আবারও পরিকল্পনা পরিবর্তন করি। বাথরুম থেকে আবার ভেন্টিলেটার বেয়ে মই দিয়ে নিচে নেমে আসি। সেখানকার মই আর চেয়ার সেখানেই রাখি। এরপর আবারও পরিকল্পনা করি এবার ইউএনওর বেডরুমে ডুকতে হবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউএনও’র বেডরুমের ভেন্টিলেটার বরাবর চেয়ার ও মই সেট করি। সেখানে আগেই একটা বাল্ব জ্বলছিলো, তা সুইচ চেপে বন্ধ করি। এরপর চেয়ার ও মই সেট করে ভেন্টিলেটার ইউএনও’র রুমে প্রবেশ করি।’

‘ভেন্টিলেটার দিয়ে রুমে প্রবেশ করায় ইউএনও টের পেয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় ইউএনও বলে, বাবা দেখোতো কোন বেয়াদব রুমে ডুকেছে। এই কথা বলে ইউএনও ওয়াহিদা খানম বিছানো থেকে ওঠার সাথে সাথে তাকে গালে ও মাথায় হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকি। এক পর্যায়ে বিছানোর পড়ে যায় ইউএনও। তার চিৎকারে পাশের রুম থেকে তার বাবা ওমর আলী শেখ এগিয়ে আসা মাত্রই তাকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দেই। দরজার চৌকাঠের সাথে ধাক্কা লাগায় সেও পড়ে যায়, রক্তাক্ত অবস্থায় আর সে উঠতে পারছিল না।’

‘এক পর্যায়ে আলমারির চাবির কথা বললে ওমর আলী শেখ চাবি রাখার স্থান বলে দেয়। পরে চাবি হাতে নিয়ে আলমারি খোলার চেষ্টা করি, কিন্তু আর আলমারি খুলতে পারি না। এরই মধ্যে মনে হলো ফর্সা হতে যাচ্ছে বাইরে। তাই তাড়াতাড়ি করে তাদের ফেলে রেখে আবার ভেন্টিলেটার দিয়ে বের হয়ে আসি। চেয়ার আর মইটি পূর্বের স্থানে রেখে আবার প্রাচীর টপকে রাস্তা দিয়ে সোজা মহাসড়কে যাই। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের উদ্দ্যেশে যাওয়া কোচে উঠে দিনাজপুরে চলে আসি। এরপর আমি আমার নিজ বাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।’

রবিউল জানিয়েছে, গত ৪ মাস আগে ইউএনওর ব্যাগ থেকে ১৬ হাজার টাকা চুরি হয়। এই টাকা পরে তাকে ফেরত দিতে হয় ৫০ হাজার টাকায়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে যাতে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হয় সেজন্য অনুরোধ করেছিলেন ইউএনওকে। কিন্তু এরপরেও তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় মামলা করা হয়।

এদিকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর তাকে ১৭ হাজার টাকা বেতনের স্থলে ৯ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছিল। যেটা দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়ে। এছাড়া যে ৫০ হাজার টাকা ধার-কর্জ করে নেয়া হয়েছিল, সেটাও শোধ করতে পারছিল না রবিউল। এমন অবস্থায় ইউএনওর ওপর হামলার পরিকল্পনা করে সে।


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা